করোনার ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিয়ে ‘তামাশা’ নয়

প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৭ ১০:১৮:৫৬ 139 Views

চিকিৎসক বার্নাড রিও’র কথা মনে আছে? নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু’র ‘দি প্লেগ’ উপন্যাসটি পড়া থাকলে নিশ্চয়ই চট করে মনে করতে পেরেছেন ডা. রিও-কে?

করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে আলোচনা হচ্ছে এর আগে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া রোগ প্লেগ নিয়েও। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ১৩৪৬-১৩৫৩ এই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের ৭৫ থেকে ২০০ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে প্লেগে। মহামারি সেই কালো মৃত্যু বা মড়ক আলবেয়ার কামুর ‘দি প্লেগ’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু। যা রচিত হয়েছে প্লেগে আক্রান্ত আলজেরিয়ার ওরাও অঞ্চলের মানবিক বিপর্যয়কে ঘিরে। উপন্যাসে দেখা গেছে- প্লেগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ওরাও শহরে দিনে দিনে বাড়ছে। আগে থেকে সচেতন না থাকা প্রশাসন শহর লকডাউন করেছে। রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে শহরজুড়ে। করোনার মতোই প্লেগে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর মিছিল পাড়ায় পাড়ায়। প্রকৃতির এমন রুদ্র রূপ আর বিপর্যয়কে ওরাও এর প্রশাসন, অধিকাংশ মানুষ নিরুপায় হয়ে মেনে নিলেও কিছু মানুষ বরাবর এসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, একে জয় করতে চেয়েছে। প্লেগ আক্রান্ত শহর ওরাও-এ সেই যুদ্ধের অগ্রভাগে ছিলেন ডা. বার্নার্ড রিও।

শুধু উপন্যাসের রিও নয়, বাস্তবে চিকিৎসকরা যেকোনো রোগ ব্যাধি ও মহামারির সময় এমন অগ্রসৈনিক হয়েই কাজ করেন। সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকলেও চিকিৎসার সময় রোগীর জীবনমরণের অংশ হয়ে যান চিকিৎসকরা। মিশে যান রোগীর রক্ত উত্তাপের সাথে। দি প্লেগ উপন্যাসে, মাদার অথনের ছেলের চিকিৎসার সময় চিকিৎসক রিও শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, নিজেকে শপে দিয়েছিলেন মানবিক উদারতায়। অথনের ছেলে যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সে সময়ের একটি চিত্র উপন্যাসে এভাবে এসেছে, ‘ছেলেটার নাড়ি টিপে ধরে যখন তিনি চোখ বুজছিলেন, তখন তিনি যেন অনুভব করছিলেন ছেলেটার নাড়ির উদ্দাম ভাবটা তার নিজের রক্তের উত্তাপের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। এইভাবে ছেলেটার সঙ্গে একাত্মবোধ করার পর তাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য তিনি যেন তার নিজের দেহের অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকলেন।’

উপন্যাসে প্লেগের চিকিৎসক বার্নার্ড লিও’র মতো কিছু নাম এই করোনা মহামারির সময় বাস্তবেও আমরা দেখছি, জানতে পারছি। উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং। রাত দিন রোগীদের সেবা দিতে দিতে ক্লান্ত লি শেষ পর্যন্ত করোনার ছোবলে ফেব্রুয়ারিতে মারা যান। করোনার চিকিৎসা দিতে গিয়ে মারা গেছেন পাকিস্তানের চিকিৎসক উসামা রিয়াজ।

ইতালির হিউম্যানিটাস গাভাজেনি হসপিটালের ডা. ডেনিলে ম্যাকিনির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া স্ট্যাটাসও আমাদের চোখে পড়েছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এখানে বাড়তি কোনো সার্জন নেই, ইউরোলজিস্ট নেই, অর্থোপেডিক্স নেই; আমরাই এই সুনামি মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছি। আমি চিকিৎসকদের চোখেমুখে যে ক্লান্তি দেখেছি, তাতেই বোঝা যায় কী পরিমাণ চাপ তাদের ওপর পড়েছে।’

আমাদের বাংলাদেশের চিকিৎসকরাও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে কোয়ারেন্টাইনে গেছেন। আতংকিত হয়ে দু’তিন আগে বেসরকারি একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসক ফোনে জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালের ১০ জন চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত। তারা কোয়ারেন্টাইনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দু’জনের অবস্থা ভালো না।’ কীভাবে তারা আক্রান্ত হলেন? সে জানালো, ‘একজন বিদেশ ফেরত করোনা আক্রান্ত রোগী তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের আইসিইউতে ছিলেন। তথ্য না থাকায় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সতর্কতামুলক পিপিই’র ব্যাবস্থা না করেই চিকিৎসার নির্দেশনা দেয়ায় তাদের এমন পরিণতি।’ এই চিকিৎসকের তথ্য অস্বীকার করতে পারিনি যখন এরকম আরো কিছু তথ্য পেয়েছি। যখন খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিয়ে অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখেছি। আমার সামনেই এক চিকিৎসককে হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের কাছে ক্ষোভ জানাতে দেখেছি।

অথচ করোনার মতো মহামারির মানবিক বিপর্যয়ের মাঝে, মৃত্যু-রোগ-শোক-ব্যাধির বিরুদ্ধে যারা জীবনপণ লড়াই করে তাদের মধ্যে চিকিৎসকরা থাকে অগ্রভাগে। কিন্তু সম্মুখ সমরের যোদ্ধা সেই চিকিৎসকদের সুরক্ষায় আমরা কী করেছি? চীনের উহানে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ প্রস্তুতির সময় পেয়েছে প্রায় ২ থেকে আড়াই মাস। কিন্তু এই সময়ে করোনা পরীক্ষার কিটের মজুদ, পরীক্ষার আওতা বাড়ানোর ব্যর্থতা ও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা শুধু নয় যারা করোনার বিরুদ্ধে সামনে থেকে লড়বেন সেই চিকিৎসকদের ব্যাক্তিগত সুরক্ষা পোশাক-পিপিই’র পর্যাপ্ত মজুদই আমরা গড়তে পারিনি।

যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার রাত সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে দাবি করেছেন, চিকিৎসকদের যথেষ্ট সুরক্ষা সরঞ্জাম ও কিট মজুদ আছে। কিন্তু একইদিনে, ভাষণের কয়েকঘণ্টা আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রজ্ঞাপনের কারণে প্রধানমন্ত্রীর দাবি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। যখন, করোনাভাইরাসের উপসর্গ আছে- এমন রোগীকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) ছাড়াই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আমিনুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশিকায় বলা হয়, ‘যদি কোনো রোগীর কোভিড-১৯’র লক্ষণ থাকে, তবে প্রথম চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেবেন এবং প্রয়োজনে পিপিই পরিধানকৃত দ্বিতীয় চিকিৎসকের কাছে প্রেরণ করবেন এবং তিনি পিপিই পরিহিত অবস্থায় রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করিবেন।’

এই নির্দেশনা সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার করেছে অধিদপ্তর। এরপরও এতে তো আঁচ করাই যায় চিকিৎসকদের জন্য পিপিই’র যথেষ্ট মজুদ আছে কিনা সরকারের কাছে? এর আগে স্যার সলিমুল্লাহ হাসপাতালের পরিচালকের এক অফিস নোটিশে আমরা দেখেছি চিকিৎসকদের সুরক্ষায় কতটা প্রস্তুত সরকার-হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সামান্য মাস্ক না দিতে পেরে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। সেই পরিচালক বদলি হয়ে নতুন পরিচালক এসেছেন। কিন্তু কর্তা ব্যক্তি বা নীতি নির্ধারকদের মানসিকতার কি পরিবর্তন হয়েছে?

গত সোমবার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী পিপিই ও পরীক্ষা কিট হস্তান্তর করছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলাম, উহানের ঘটনার দুই আড়াইমাসেও কেনো পিপিইর যথেষ্ট মজুদ করা সম্ভব হয়নি? মন্ত্রীর উত্তর ছিলো, আগে তো প্রয়োজন ছিলো না। এখন প্রয়োজন হয়েছে, এখন আনা হচ্ছে। কিন্তু তখন আনা হলে, এখন পিপিই নিয়ে চিকিৎসকদের মাঝে যে হাহাকার, কিছু চিকিৎসক যে আক্রান্ত হয়ে ঝুঁকির মুখে-সেই পরিস্থিতি কি রোধ করা যেতো না অনেকটা? স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলেছেন, আরো কয়েক লাখ পিপিই আসছে।

নীতি নির্ধারকদের পাশ কাটানোর এমন মানসিকতায় কি পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে না? অস্বীকারের এমন কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতির কারণে চিকিৎসকদের ঢাল তলোয়ার ছাড়া করোনার সামনে ঠেলে দেয়া হচ্ছে না? বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে এমন অবস্থাই দেখা যাচ্ছে। জারি করা সেই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিলো, ‘কোনো হাসপাতাল যদি রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরী চিকিৎসা বা নতুন রোগীকে ভর্তি করাসহ চিকিৎসা সেবায় যথাযথ ব্যবস্থা না নেয় তাহলে ভুক্তভোগীকে স্থানীয় সেনাবাহিনীর টহল পোস্ট বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানাতে হবে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ শেষ পর্যন্ত এই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু পরিস্থিতি হলো, চিকিৎসা দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেনস্থার শিকার হয়েছেন রাজবাড়ীর একজন চিকিৎসক। অবশ্য ওসি ভুল স্বীকার করায় বিষয়টির মিটমাটও হয়েছে।

করোনা আক্রান্তদের ব্যাধি ও মৃত্যুর মোকাবিলায় সারা বিশ্বেই ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা চিকিৎসকরা। পরাক্রমশালী শাসক, নীতি নির্ধারকরা, এখানে শুধু ব্যবস্থাপক, সহায়ক ও নীতি পরিকল্পনাকারী। তাই এখন মূল কাজ, মজুদ পিপিই ও সরঞ্জাম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথমে সম্মুখ সমরের যোদ্ধা চিকিৎসকদের দেয়া। তাদের আগে করোনা নিয়ে সরাসরি কাজ না করা প্রশাসনের কেউ যেন পিপিই না পায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কিছু ছবি নিয়ে সমালোচনা চলছে। এর পাশাপাশি চিকিৎসকরা কাজের ক্ষেত্রে রাস্তায়, হাসপাতালে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে সেদিকে নজর রাখতে হবে। এই সময়ে এমন কোনো আদেশ-নির্দেশ জারি করা উচিত হবে না, যেন চিকিৎসকদের মনোবল ভেঙে যায়। তবে আশার বিষয় পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। সমন্বিত কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে গত ২৪ ঘণ্টায়। ভুল করলেও অনেক ক্ষেত্রে শুধরে নেয়া হচ্ছে।

এই অবস্থায় আবারও ফিরে আসি আলবেয়ার কামুর উপন্যাস ‘দি প্লেগ’ ও ডাক্তার বার্নার্ড রিও’র কাছে। আলজেরিয়ার ওরাও শহরে প্লেগের বিরুদ্ধে সংগ্রামরতদের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন ডা. রিও। অনেককে চিকিৎসা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এই যুদ্ধে তার জীবনেই ঘটে গেছে বড় ট্রাজেডি। প্লেগ আক্রমণের আগে ডা. রিও তার অসুস্থ স্ত্রীকে স্যানেটোরিয়াম বা স্বাস্থ্য নিবাসে পাঠিয়েছিলেন আরোগ্য লাভের আশায়। প্লেগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে একবার খোঁজ নেয়ারও সুযোগ পাননি স্ত্রীর। কিন্তু শেষে প্লেগের আক্রমণ যখন কমে আসে, ওরাও শহরের মানুষ যখন মুক্তির আনন্দে আনন্দ উৎসবে মাতে, শহরের প্রবেশ পথ খুলে দেয়া হয়, তখন ডাক্তার রিও পান স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ।

উপন্যাসের ড. রিও’র স্ত্রী বিয়োগ কিংবা বাস্তবের চিকিৎসক উহানের লি ওয়েনলিয়াং বা পাকিস্তানের উসামা রিয়াজের মৃত্যু-আত্মত্যাগ নিশ্চয়ই আমাদের মনে রাখা উচিত। তাই আবারও বলছি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা উচিত চিকিৎসকদের সুরক্ষা। তাহলেই জয়ী হবে অদৃশ্য ঘাতক কোভিড-১৯’র বিরুদ্ধে আমাদের সর্বাত্মক লড়াই।

ট্যাগ :



চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মোঃ আব্দুল আজিজ
ডিএমডি : মোঃ আরমান তারেক

বার্তা কক্ষ :

ঢাকা অফিস : ৬ষ্ঠ তলা,আইভরীকৃষ্ণচূড়া,৩/১ ই পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
চট্টগ্রাম অফিস : সায়মা আবুল স্কয়ার,বড়পুল,হালিশহর,চট্টগ্রাম।
ফোন : ০১৮১৭-৭৪৩৩৮৭
মেইল : channelkornofuli.org@gmail.com